গাজায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেই তীব্র জনরোষ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। কারণ বিভিন্ন প্রতিবেদন ও স্থানীয় সাক্ষ্যে দাবি করা হয়েছে, মানবিক সহায়তার চালানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু চ্যানেল ব্যবহার করে অবরুদ্ধ গাজায় সিগারেট প্রবেশ করেছে।
এমন সময়ে এই অভিযোগ সামনে এলো, যখন ফিলিস্তিনিরা গাজার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। খাদ্য, ওষুধ ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট চলছে, আর হাজারো পরিবার বেঁচে থাকার ন্যূনতম প্রয়োজনীয় জিনিসও সংগ্রহ করতে পারছে না।
ক্ষুধা ও চিকিৎসা সংকটের মধ্যে জনরোষ
এই খবর প্রকাশের পর ফিলিস্তিনিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যখন গাজায় দুর্ভিক্ষ বিস্তার এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ধস নিয়ে সতর্ক করে যাচ্ছে, তখন এমন অভিযোগ মানুষকে আরও হতবাক করেছে।
যেসব মানুষ আটা, শিশুখাদ্য, খাবার ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধের আশায় অপেক্ষা করছেন, তারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এই দাবিতে যে, এসবের বদলে গাজায় সিগারেট প্রবেশ করানো হয়েছে।
স্থানীয় কর্মী ও সাংবাদিকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেন। তাদের দাবি, সেখানে দেখা গেছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP)-সংশ্লিষ্ট চালানের মাধ্যমে সিগারেট গাজায় প্রবেশ করছে। এসব অভিযোগ ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। অনেক ফিলিস্তিনি বলেন, এমন ভয়াবহ মানবিক সংকটের মধ্যে সিগারেট প্রবেশ করানো ত্রাণ ব্যবস্থার অগ্রাধিকারে বিপজ্জনক বিকৃতি প্রকাশ করে এবং ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা আরও কমিয়ে দেয়।
“গাজার প্রয়োজন খাবার, বিলাসপণ্য নয়”
স্থানীয় গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে গাজার বাসিন্দারা বলেন, এখন গাজার মানুষের প্রয়োজন কোনো গৌণ বা অপ্রয়োজনীয় পণ্য নয়; বরং জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসামগ্রী। তারা উল্লেখ করেন, অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। হাসপাতালগুলো কার্যত ভেঙে পড়েছে এবং জরুরি ওষুধ ও অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম প্রায় শেষ হয়ে গেছে। স্থানীরা গাজায় ত্রাণ প্রবেশ তদারকি করা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কঠোর সমালোচনা করেছেন। তারা এসব চালানের প্রকৃতি এবং তদারকি প্রক্রিয়া সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দাবি করেছেন।
অনেকেই বলেন, এমন ভয়াবহ অর্থনৈতিক দুর্ভোগের মধ্যে সিগারেট প্রবেশের খবর প্রতিদিন ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও মৃত্যুর মুখোমুখি থাকা মানুষের জন্য চরম উসকানিমূলক।
অভিযোগ অস্বীকার বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি’র
এ ঘটনায় বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সংস্থাটি বলেছে, মানবিক সহায়তার ট্রাক ব্যবহার করে সিগারেট পাচারের অভিযোগ ভিত্তিহীন। তারা দাবি করেছে, গাজায় তাদের সব কার্যক্রম সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মান বজায় রেখেই পরিচালিত হয়।
ডব্লিউএফপি জানায়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে প্রতিটি চালান সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করা হয়, যাতে সহায়তা নিরাপদভাবে এবং পূর্ণাঙ্গভাবে উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায়। সংস্থাটি আরও বলেছে, এসব অভিযোগ তাদের সুনাম ক্ষুণ্ন করা এবং গাজায় মানবিক কার্যক্রম ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে ছড়ানো হচ্ছে।
ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থা নিয়ে বাড়ছে সমালোচনা
গাজায় কার্যরত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এরই মধ্যে ত্রাণ সরবরাহের ধীরগতি এবং প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল সহায়তার কারণে বাড়তি সমালোচনার মুখে রয়েছে।
ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ উঠেছে যে, এটি সবার জন্য ন্যায্যভাবে সহায়তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। পাশাপাশি দুর্নীতি ও বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও সন্দেহ বাড়ছে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গাজার অধিকাংশ মানুষ এখন প্রায় পুরোপুরি মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। কারণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে এবং আয়ের উৎস প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
কালোবাজারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক আহমেদ আবু কামার বলেন, গাজায় বিপুল পরিমাণ সিগারেট প্রবেশের ঘটনা দেখে মনে হচ্ছে এটি ফিলিস্তিনি কিছু পক্ষ ও ইসরায়েলি পক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমেই সংগঠিত হয়েছে, যা ক্রমবর্ধমান কালোবাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অংশ।
তিনি বলেন, এটিকে সাধারণ “পাচার” বলা ঠিক হবে না। কারণ এত বড় পরিমাণ চালান বহু পক্ষের পূর্বসমন্বয় ছাড়া গাজায় প্রবেশ করা সম্ভব নয়। তার মতে, পণ্যগুলো বাণিজ্যিক বা মানবিক, যে চ্যানেল দিয়েই প্রবেশ করুক না কেন, এটি এমন একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়, যা অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।
তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিক তদন্ত ছাড়া বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিশ্চিতভাবে সত্য বলা যাবে না।
গাজার অর্থনীতিতে কালোবাজারের আধিপত্য
আবু কামারের মতে, বর্তমানে গাজার প্রায় পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই কালোবাজারের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এর মধ্যে বাণিজ্য, কৃষি, শিল্প এমনকি ব্যাংকিং কার্যক্রমও রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা বাজারের নগদ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং সংকটকে কাজে লাগিয়ে অনানুষ্ঠানিক পথে অত্যন্ত লাভজনক পণ্য বাজারে আনছেন।
তার ভাষায়, “আসল পাচার বলতে এক-দুই কার্টন বোঝায়, বিশাল চালান নয়।” তিনি মনে করেন, এত বড় পরিমাণ সিগারেট প্রবেশ স্পষ্টতই পূর্বপরিকল্পিত।
তিনি আরও জানান, গাজায় সিগারেটের দাম এখন রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগে যে সিগারেটের প্যাকেট ১৩ থেকে ১৫ শেকেলে বিক্রি হতো, এখন তা সংকট ও অর্থনৈতিক ধসের কারণে ৮০০ থেকে ১,০০০ শেকেলে বিক্রি হচ্ছে।
নগদ অর্থ সংকট ও বৈষম্য বৃদ্ধি
আবু কামার সতর্ক করে বলেন, সিগারেটের ব্যবসা স্থানীয় বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ শুষে নিচ্ছে, এমন সময়ে যখন গাজা ভয়াবহ তারল্য সংকটে ভুগছে।
তার মতে, মানুষ বাধ্য হয়ে অস্বাভাবিক দামে অল্প পরিমাণ সিগারেট কিনছে, ফলে সাধারণ মানুষের অর্থ সীমিত কয়েকজন ব্যবসায়ীর হাতে চলে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, এই সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি ভয়াবহ সামাজিক বৈষম্যও তৈরি করছে। গাজার ভেতরে সম্পদ ও প্রভাব ধীরে ধীরে অল্প কয়েকজন শক্তিশালী ব্যবসায়ীর হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, যারা তার ভাষায় “সরকারি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়েও শক্তিশালী” হয়ে উঠেছে।
আগেও ঘটেছে বিতর্কিত পণ্য প্রবেশের ঘটনা
আবু কামার বলেন, এটি প্রথম ঘটনা নয়। এর আগেও নানা বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও গাজায় সিগারেট, ব্যাটারি, সৌর প্যানেল এবং নির্মাণসামগ্রী, এমনকি সিমেন্টও প্রবেশ করেছে।
যদিও ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে এসব পণ্যের প্রবেশ সীমিত করে রেখেছে, তারপরও স্থানীয় বাজারে উচ্চমূল্যের কারণে সেগুলো কোনো না কোনোভাবে পৌঁছে যাচ্ছে।
তার মতে, এমন ঘটনা বারবার সামনে আসা গাজার অর্থনীতি ও বাজার ব্যবস্থার গভীর কাঠামোগত সংকটেরই প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি পণ্য ও মানবিক সহায়তা প্রবেশ-সংক্রান্ত সংকট সমাধানে জরুরি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট করে।
কৃতজ্ঞতায় : sunnah file web
তারিখ : ১০ /০৫/২০২৬
"সিগারেট নয়, রুটি চাই": গাজায় বিতর্কিত ত্রাণ নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছে ফিলিস্তিনিরা
বাংলাদেশের হৃদয়ে ফিলিস্তিন: আলেম, বিশ্ববিদ্যালয় ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে ‘উলামায়ে উম্মাহ’-র প্রতিনিধি দলের ব্যাপক সংযোগ
দ্য ইকোনমিস্ট: গাজায় এখন ইঁদুর ছাড়া সবকিছুই স্থবির
হালাল এওয়ারনেস নেটওয়ার্কের উদ্যেগে রোড ট্রিপ ও নিউক্যাসলে দিনব্যাপী হালাল স্ট্রিট ক্যাম্পেইন সমাপ্ত
গাজায় গণহত্যার নতুন কৌশল: নিভৃতে চলছে নিধন
আল-আকসা দখল হলে আমাদের করণীয় কী ?
‘বাংলাদেশে দ্বীনের খেদমতে যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাংলাদেশীদের করণীয়: যুবসমাজ, পরিবার ও ইসলামী পরিচয় রক্ষায় ভূমিকা’ শীর্ষক
গাজায় চরম পানি সংকট: আল-মাওয়াসিতে তৃষ্ণায় মৃত্যুর মুখে হাজারো মানুষ
ইসরায়েলের ‘একতরফা মৃত্যুদণ্ড’ নীতি: আট দেশের তীব্র নিন্দা
সিলেটে সিম্পল রিজন চ্যারিটির উদ্যেগে ফ্রি সুন্নাতে খতনা ক্যাম্প অনুষ্ঠিত
ফিলিস্তিনি মুসলিম পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা ইসরায়েলের
গাজায় নারীদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম পরিবেশও দিচ্ছে না ইসরায়েল: অ্যামনেস্টি
আল-আকসা মসজিদ কি শিগগিরই বন্ধ হতে যাচ্ছে?
গাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে সুদানের দুর্ভিক্ষ: ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে রমজানের আগমন
গাজায় “দ্য ভ্যাপোরাইজড”: এক অনুসন্ধানে এমন ইসরায়েলি অস্ত্রের তথ্য উঠে এসেছে, যা হাজারো ফিলিস্তিনিকে নিশ্চিহ্ন
"সিগারেট নয়, রুটি চাই": গাজায় বিতর্কিত ত্রাণ নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছে ফিলিস্তিনিরা
বাংলাদেশের হৃদয়ে ফিলিস্তিন: আলেম, বিশ্ববিদ্যালয় ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে ‘উলামায়ে উম্মাহ’-র প্রতিনিধি দলের ব্যাপক সংযোগ
দ্য ইকোনমিস্ট: গাজায় এখন ইঁদুর ছাড়া সবকিছুই স্থবির
হালাল এওয়ারনেস নেটওয়ার্কের উদ্যেগে রোড ট্রিপ ও নিউক্যাসলে দিনব্যাপী হালাল স্ট্রিট ক্যাম্পেইন সমাপ্ত
গাজায় গণহত্যার নতুন কৌশল: নিভৃতে চলছে নিধন
আল-আকসা দখল হলে আমাদের করণীয় কী ?
‘বাংলাদেশে দ্বীনের খেদমতে যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাংলাদেশীদের করণীয়: যুবসমাজ, পরিবার ও ইসলামী পরিচয় রক্ষায় ভূমিকা’ শীর্ষক
গাজায় চরম পানি সংকট: আল-মাওয়াসিতে তৃষ্ণায় মৃত্যুর মুখে হাজারো মানুষ
ইসরায়েলের ‘একতরফা মৃত্যুদণ্ড’ নীতি: আট দেশের তীব্র নিন্দা
সিলেটে সিম্পল রিজন চ্যারিটির উদ্যেগে ফ্রি সুন্নাতে খতনা ক্যাম্প অনুষ্ঠিত
ফিলিস্তিনি মুসলিম পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা ইসরায়েলের
গাজায় নারীদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম পরিবেশও দিচ্ছে না ইসরায়েল: অ্যামনেস্টি
আল-আকসা মসজিদ কি শিগগিরই বন্ধ হতে যাচ্ছে?
গাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে সুদানের দুর্ভিক্ষ: ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে রমজানের আগমন
গাজায় “দ্য ভ্যাপোরাইজড”: এক অনুসন্ধানে এমন ইসরায়েলি অস্ত্রের তথ্য উঠে এসেছে, যা হাজারো ফিলিস্তিনিকে নিশ্চিহ্ন