সাইফুদ্দীন আহমদ।
পূর্ব আফ্রিকায় পর্তুগিজ বাণিজ্য কেন্দ্র।
আফ্রিকার পূর্ব উপকূলীয় রাজ্য এবং শহরগুলির মধ্যে কার্যকরী বাণিজ্য রুট ছিলো, যেখানে স্বর্ণ এবং হাতির দাঁতের ব্যাবসা ছিলো সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ।
শতকের পর শতক আরব বণিকরা আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের রাজ্য যেমনঃ গ্রেট জিম্বাবুয়ে, মাওনামুতাপা ( আধুনিক মোজাম্বিক ) রাজ্যের সাথে বাণিজ্য করতো। আরব বণিকরা এসব অঞ্চল থেকে হাতির দাঁত, স্বর্ণ নিয়ে আরব, পারস্য, ভারতবর্ষ ও চীনে বিক্রি করতো।
আরব বণিকরা ব্যাবসা করার পাশাপাশি স্থানীয় মেয়েদের বিয়ে করে পূর্ব আফ্রিকান উপকূলে স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন এবং সেইসাথে ইসলাম ধর্মের প্রচার করতেন। পাশাপাশি স্থানীয় " সোহালি " ভাষাকে ব্যাপক সমৃদ্ধ করেন আরব বণিকরা।
আরব বণিকদের ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের ফলে পূর্ব আফ্রিকা জুড়ে আফ্রিকান এবং ইসলামী সংষ্কৃতির সমন্বয়ে এক জীবনমুখী সভ্যতা গড়ে উঠে। এই জীবনমুখী প্রাণবন্ত পূর্ব আফ্রিকান সভ্যতা উন্নত জীবনযাত্রার লক্ষ্যে অঞ্চলটির উপকূল জুড়ে অনেকগুলো শহর স্থাপন করে নিজস্ব রুচিবোধ এবং সংষ্কৃতির সমন্বয় ঘটিয়ে। জানজিবার, কিলওয়া, মোমবাসা, মোজাম্বিক দ্বীপ, সোফালা নামক পূর্ব আফ্রিকান শহরগুলো এই অঞ্চলের মাটিতে ইসলাম ও সভ্যতার এক অপরূপ মিশ্রণের আজো সাক্ষী হিসেবে রয়েছে।
বিভীষিকাময় পর্তুগিজ থাবা!
ষোড়শ শতাব্দীতে পূর্ব আফ্রিকার বুকে পা রাখে পর্তুগিজরা। তারা শুরুতেই আরবদের এই অঞ্চল থেকে যুদ্ধের মাধ্যমে হটিয়ে দেয়। আরবদের হটানোর পর বিস্তীর্ণ পূর্ব আফ্রিকান অঞ্চলগুলোর বাণিজ্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠে পর্তুগিজরা।
ভারী অস্ত্রসস্ত্র এবং উন্নতমানের জাহাজে করে পর্তুগাল থেকে পূর্ব আফ্রিকার বুকে নামতো পর্তুগিজ সৈনিকরা। তারা স্থানীয় মুসলিম শাসকদের নিকট বিপুল পরিমাণ কর দাবি করতো এবং মুসলিম সুলতানদের পর্তুগিজ রাজার বশ্যতা স্বীকার করার নির্দেশ দিতো।
মুসলিম সুলতানেরা এই আদেশ না মানলে পর্তুগিজ সৈনিকেরা সেই অঞ্চলটি প্রথমে লুট করতো এবং পরিশেষে উন্নত কামানের সাহায্যে গোলাবর্ষণ করে ধ্বংস করে দিতো। পর্তুগিজরা মনেপ্রাণে ধারণ করতো, পূর্ব আফ্রিকায় মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে তারা পবিত্র ক্রুসেড করছে। ( ক্রুসেড হলো সেই যুদ্ধ যা মধ্যযুগের শুরুতে তিন শতকের মতো স্থায়ী হয়েছিলো মুসলিম এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে। ক্রুসেড মূলত ইউরোপীয় খ্রিস্টান শক্তির সাথে আরবীয় মুসলিম শক্তির মধ্যে সংঘটিত হয়।)
পর্তুগিজদের হাতে সর্বপ্রথম বিধ্বস্ত হওয়া পূর্ব আফ্রিকান শহর হলো জানজিবার। ১৫০৩ সালে জাহাজ হতে ভারী কামানের সাহায্যে অনবরত গোলা নিক্ষেপের মাধ্যমে আরব বণিকদের সাজানো জানজিবার কে ধ্বংস করে দেয় পর্তুগিজ বাহিনী।
১৫০৫ সালে পর্তুগিজ ক্যাপ্টেন ফ্রান্সিসকো আলমেইডা ১১ টি ভারী অস্ত্রসজ্জিত জাহাজে করে পূর্ব আফ্রিকায় অভিযান পরিচালনা করেন মুসলিম আরব সুলতানদের বিরুদ্ধে। তার এই নারকীয় অভিযানে ধ্বংস হয় কিলওয়া, মোমবাসা, বারাওয়া নামক তিনটি পূর্ব আফ্রিকান শহর।
পূর্ব আফ্রিকান উপকূলে নিজেদের শক্তিমত্তা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে মোমবাসা, কিলওয়া, সোফালা, মোজাম্বিক দ্বীপে বেশকিছু সামরিক দুর্গ স্থাপন করে পর্তুগিজরা। এতে করে সম্পূর্ণ ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্য পর্তুগিজদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। পাশাপাশি পূর্ব ও মধ্য আফ্রিকান রাজ্যসমূহের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যেও পর্তুগিজ আধিপত্য কায়েম হয়।
পর্তুগিজরা তাদের নিয়ন্ত্রিত সোফালা শহর থেকে পাশ্ববর্তী মাওনামুতাপা রাজ্যের সাথে স্বর্ণ, হাতির দাঁতের ব্যাবসা করতো। বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সোফালা শহরের উত্তরে কিওলিমানে শহরেও পর্তুগিজরা বাণিজ্য কুটি স্থাপন করে। পূর্ব আফ্রিকার জাম্বেসি নদীর তীরে সেনাহ এবং টেটে শহরেও পর্তুগিজ কুটি স্থাপিত হয়।
এভাবে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ পূর্ব আফ্রিকা হতে আরব বণিকদের হটিয়ে নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে পর্তুগিজরা।
পূর্ব আফ্রিকায় আরবদের হটিয়ে একক আধিপত্য কায়েম করলেও পর্তুগিজরা এই অঞ্চলে বহুমুখী সমস্যার সম্মুখীন হতে থাকে।
→ এখানকার উষ্ণ আবহাওয়া পর্তুগিজদের পক্ষে সহনীয় হয়নি।
→ গরমজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে বহু পর্তুগিজ বণিক, নাবিক, সৈন্য মারা যেতে থাকে।
→ স্থানীয় ছোট ছোট গোত্রসমূহের দ্বারা প্রতিনিয়ত আক্রমণের শিকার হতে থাকে পর্তুগিজরা। এতে করে উপকূল ছেড়ে পূর্ব আফ্রিকার ভিতরের অঞ্চলে ঢুকতে সক্ষম হয়নি পর্তুগিজরা।
এতসব অসুবিধা স্বত্বেও স্থানীয় কিছু রাজ্যের সাথে সমঝোতা করে পর্তুগিজরা পূর্ব আফ্রিকান উপকূলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্ষম হয়।
পর্তুগিজরা বিশ্বাস করতো ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্ম প্রচার করা তাদের আবশ্যিক কর্তব্য। এ লক্ষ্যে ১৫৬০ সালে পূর্ব আফ্রিকায় তারা মিশনারী কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করে। তারা পূর্ব আফ্রিকার বহু উপজাতি জনগোষ্ঠীকে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করতে সক্ষম হন। এমনকি মাওনামুতাপা রাজবংশের একজন প্রিন্স'কেও পর্তুগিজরা খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত করতে সমর্থ হয়।
ষোড়শ শতাব্দীর শুরুর দিকে পর্তুগিজরা আফ্রিকা হতে ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে পারস্য উপসাগরের হরমুজ অঞ্চলে ঘাঁটি স্থাপনে সক্ষম হন। পাশাপাশি এ সময়ে তারা ভারতের পশ্চিম উপকূলীয় গোয়া অঞ্চলে শক্তিশালী ঘাঁটি স্থাপনে সমর্থ হয়। মালাক্কা প্রণালি পাড়ি দিয়ে এসময় পর্তুগিজরা ইন্দোনেশিয়ার উপকূলেও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে নেয়।
ভারত মহাসাগরের চতুর্দিকে নিজেদের শক্তিশালী ঘাঁটি স্থাপনের মাধ্যমে এসময় পর্তুগিজরা সম্পূর্ণ ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্য নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আনে। কিন্তু পর্তুগিজরা শুধুমাত্র সাগরের বুকে শক্তিশালী ছিলো। স্থলভাগে পর্তুগিজরা আধিপত্য কায়েম করতে সক্ষম হয়নি কখনো।
ফলে যখন ডাচ, ফরাসি, ইংরেজদের মতো বড় বড় ইউরোপীয় শক্তি আফ্রিকা এবং এশিয়ার বুকে পদার্পণ শুরু করে, তখন থেকে পর্তুগিজ আধিপত্য হ্রাস পেতে থাকে।
১৬৫০ সালের মধ্যে পূর্ব আফ্রিকায় ডেলাগো বে, মোজাম্বিক দ্বীপ এবং মোমবাসা বাদে বাকি সব অঞ্চল পর্তুগিজদের হাতছাড়া হয়ে পড়ে। পর্তুগিজদের হাতছাড়া হওয়া অঞ্চলগুলো ব্রিটিশ, ফরাসী এবং ডাচদের হস্তগত হয়।
১৮৮৫ সালে আফ্রিকায় ইউরোপীয় কলোনির ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বার্লিনে একটি কনফারেন্স হয়। আর ঐ কনফারেন্সে পূর্ব আফ্রিকার মোজাম্বিক বাদে বাকি সমস্ত অঞ্চল পর্তুগিজদের ছেড়ে দিতে হয় অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তির হাতে।
এভাবে একসময়কার পূর্ব আফ্রিকান ত্রাস পর্তুগিজরা এই অঞ্চলে সমস্ত প্রভাব হারিয়ে ফেলে এবং পর্তুগিজদের প্রভাব টা চলে যায় ফ্রান্স, ডাচ, ব্রিটিশ, ইতালীয়দের নিকট।
পর্তুগিজদের কারণে পূর্ব আফ্রিকায় কিরূপ পরিবর্তন সাধিত হয়?
→ ভারত মহাসাগরজুড়ে বিস্তৃত আরব বণিকদের আফ্রিকা - আরব - ভারত রুটের বাণিজ্য কার্যক্রম পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয় পর্তুগিজরা।
→ পূর্ব আফ্রিকার স্বর্ণ, হাতির দাঁত, দাস ব্যাবসার নিয়ন্ত্রণ থেকে আরবদের হটিয়ে পর্তুগিজরা তাদের আধিপত্য কায়েম করে।
→ জাম্বেজি নদীর উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের মাধ্যমে পূর্ব আফ্রিকার অভ্যন্তরীণ রাজ্যগুলোর বাণিজ্য পথের নিয়ন্ত্রণ একচেটিয়াভাবে দখল করে নেয় পর্তুগিজরা। এতে করে স্থানীয় রাজ্যগুলো বাণিজ্য করতে বাঁধার সম্মুখীন হতে থাকে, যদিনা তারা পর্তুগিজদের সাথে মিত্রতা স্থাপন না করে।
→ মোজাম্বিকে এখনো পর্যন্ত শহুরে মানুষের ভাষা হিসেবে পর্তুগিজ ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে। যদিও দেশটির সিংহভাগ গ্রামীণ জনগণ স্থানীয় বানতু ভাষায় কথা বলে থাকে।
→ মোজাম্বিকের ৩০% জনগণকে ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করতে সক্ষম হয়েছে পর্তুগিজ মিশনারীরা। বাদবাকি জনগণ স্থানীয় আফ্রিকান ধর্ম অনুসরণ করে।
২৫ বছরের প্রতারণা: 'সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ' দিয়ে যেভাবে মুসলিমদের কলঙ্কিত করেছে পশ্চিমারা
সিম্পল রিজনের উদ্যোগে সিলেটে কুরআন বিতরণ কর্মসূচি সম্পন্ন
প্রাণীদের প্রতি আচরণে মহানবী ﷺ-এর আদর্শ
পশ্চিমা বিশ্বে নিজেদের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে ইসলামবিদ্বেষকে ব্যবহার করছে ইসরায়েল
লন্ডনে তালিমুল কুরআন ইউকে মসজিদের ১৩তম বার্ষিক ওয়াজ মাহফিল অনুষ্ঠিত
গাজায় মৃতদের দাফনের জন্যও ফুরিয়ে আসছে জায়গা
কেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব?
মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মের সময় কী কী নিদর্শন প্রকাশ পেয়েছিল?
যেসব বৈশিষ্ট্য ইসলামকে অনন্য করে তুলেছে
রাসুল ﷺ ও তাঁর পরিবার মাসের পর মাস 'যে দুই কালো খাবারে' জীবনধারণ করেছিলেন
মেলবোর্নে মসজিদের কাছে মুসলিম বাবার ওপর হামলা, অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ছে ইসলামবিদ্বেষ
ফ্রান্সে মসজিদ বন্ধ: মুসলিম সমাজে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের আতঙ্ক
স্কুলে যাওয়ার আগে শিশুকে টয়লেট ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিতে হবে: যুক্তরাজ্যে অভিভাবকদের জন্যও টয়লেট প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা
যা আল্লাহর হাতে, তা আল্লাহর কাছেই ছেড়ে দিন
কিয়ামতের অন্যতম বড় আলামত: দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ ও তার ফিতনা থেকে মুক্তির পথ
২৫ বছরের প্রতারণা: 'সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ' দিয়ে যেভাবে মুসলিমদের কলঙ্কিত করেছে পশ্চিমারা
সিম্পল রিজনের উদ্যোগে সিলেটে কুরআন বিতরণ কর্মসূচি সম্পন্ন
প্রাণীদের প্রতি আচরণে মহানবী ﷺ-এর আদর্শ
পশ্চিমা বিশ্বে নিজেদের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে ইসলামবিদ্বেষকে ব্যবহার করছে ইসরায়েল
লন্ডনে তালিমুল কুরআন ইউকে মসজিদের ১৩তম বার্ষিক ওয়াজ মাহফিল অনুষ্ঠিত
গাজায় মৃতদের দাফনের জন্যও ফুরিয়ে আসছে জায়গা
কেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব?
মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মের সময় কী কী নিদর্শন প্রকাশ পেয়েছিল?
যেসব বৈশিষ্ট্য ইসলামকে অনন্য করে তুলেছে
রাসুল ﷺ ও তাঁর পরিবার মাসের পর মাস 'যে দুই কালো খাবারে' জীবনধারণ করেছিলেন
মেলবোর্নে মসজিদের কাছে মুসলিম বাবার ওপর হামলা, অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ছে ইসলামবিদ্বেষ
ফ্রান্সে মসজিদ বন্ধ: মুসলিম সমাজে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের আতঙ্ক
স্কুলে যাওয়ার আগে শিশুকে টয়লেট ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিতে হবে: যুক্তরাজ্যে অভিভাবকদের জন্যও টয়লেট প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা
যা আল্লাহর হাতে, তা আল্লাহর কাছেই ছেড়ে দিন
কিয়ামতের অন্যতম বড় আলামত: দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ ও তার ফিতনা থেকে মুক্তির পথ