২৩শে ফেব্রুয়ারি – ১৯৯১ সাল।
ভারতের দখলকৃত কাশ্মীরের কুপওয়ারা জেলার দু’টি গ্রাম কুনান ও পোশপোরা। ভূস্বর্গ খ্যাত কাশ্মীরের অপরূপ গ্রাম দুটিতে ২৩শে ফেব্রুয়ারি কুয়াশা-শুভ্র, শীতল দিনটি অন্য দশটা দিনের মতো স্বাভাবিকভাবে অতিবাহিত হলেও, রাতটি স্বাভাবিক ছিলো না। রাতে হানা দেয় ভারতীয় বাহিনীর মনুষ্যরূপী পিশাচেরা। সে ভয়াল রাতটিকে চিহ্নিত বা প্রকাশ করার মতো শব্দ হয়তো আজও সৃষ্টি হয়নি, আর এটা হয়তো সম্ভবও নয়। তবে রাতটি মানব ইতিহাসের এক বীভৎস তম কালো অধ্যায় হিসেবে মনুষ্য জাতিকে ধিক্কার দিয়ে যাবে যুগ যুগ ধরে।
সে রাতে স্বাধানতাকামীদের জঙ্গী আখ্যা দিয়ে তল্লাশিতে নামে ভারতীয় সেনাবাহিনীর এলিট ব্রিগেড, চতুর্থ রাজপুতানা রাইফেলস এবং ৬৮ মাউন্টেন ব্রিগেড। ভারতীয় সম্মিলিত হানাদার বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সেনারা প্রথমে গ্রাম দুটিকে ঘিরে ফেলে। এরপর অপারেশনের শুরুতে গ্রামের সকল পুরুষদের একসাথে জড়ো করা হয়, অস্ত্র আর 'জঙ্গিদের' খোঁজে শুরু হয় অবর্ণনীয় শারীরিক অত্যাচার। ঘরগুলোকে পুরুষ শূন্য করার পর নরপিশাচ মালাউন বাহিনীর লোলুপদৃষ্টি পড়ে মুসলিম মা-বোনদের উপর। বর্বর হায়েনারা ঘরে ঘরে ঢুকে মেয়েদের যৌননিগ্রহ আর গণধর্ষণ শুরু করে৷ তাদের যৌননিগ্রহ থেকে ৭ বছরের শিশু থেকে ৭০ বছরের অতিশীপর বৃদ্ধা কেউই রক্ষা পায়নি। ধর্ষিতার আত্মচিৎকার এই ঘৃণ্য নরপশুদের বিবেককে জাগ্রত করেনি, বরং করেছে আরো বীভৎস।
সেই রাতের কথা এক ধর্ষিতা মহিলা জবানবন্দীতে বলেন – “প্রথমে ওরা পানি চাইলো, তারপর তারা আমাদের ছুঁতে শুরু করল। প্রথমে চারজন করে উপরে এল, তারা চলে যেতে ফের নতুন চার জন।”
এভাবেই নির্যাতন চালানো হয় ১৯৯১ সালের ২৩ ও ২৪ ফেব্রুয়ারি। সে রাতে মোট কতজন নারী নিগ্রহের শিকার হয়েছিলেন তার সঠিক পরিসংখ্যান জানা সম্ভব হয়নি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য ডিপ্লোম্যাটের মতে দের শতাধিক নারী যৌন নিগ্রহের শিকার হন। দু'শতাধিক পুরুষ নির্মম নির্যাতনের শিকার হন।[1] তবে ভারতীয় সেনাবাহিনী পুরো নির্যাতনের ঘটনা নাকচ ও ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে।
ঘটনার পরপরই গ্রামের চৌকিদার জুমা শেখ বিচারের জন্য সেই ঘটনা নিয়ে গ্রামের ৩২ জন নারী-পুরুষের স্বাক্ষর করা (আঙুলের ছাপ দেওয়া) একটি বয়ান নিয়ে তহশিলদারের কাছে জমা দিতে যান, কিন্তু সেটি গ্রহণ করা হয়নি, কারণ দু’জন কনস্টেবল যারা সেনাবাহিনীর সঙ্গে এসেছিল তারা, সে রাতে কোনও অত্যাচার হয়নি, কোনও সম্পত্তি খোয়া যায়নি বলে ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ দেয় (বা দিতে বাধ্য হয়), তার ভিত্তিতে পুলিশ এফআইআর নিতে অস্বীকার করে৷
এরপর ওই বরফ এবং ঠান্ডার মধ্যেও গ্রামের মানুষের লাগাতার আন্দোলনে শেষ পর্যন্ত এফআইআর দায়ের হয়, ফলে ডাক্তারি পরীক্ষা হয় আরও পরে৷ ১৫ মার্চ ১৩ জনের আর ২১ মার্চ ১৯ জনের ডাক্তারি পরীক্ষা হয়েছে এবং ধর্ষণজনিত আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে ব্লক মেডিকেল অফিসারের নথি থাকলেও পুরুষদের ক্ষেত্রে যে রকম ‘ইনজুরি সার্টিফিকেট’ দেওয়া হয়েছিল, মেয়েদের ক্ষেত্রে তা পুলিশ জমা করেনি৷ এরপর ১০ মার্চ সেনাবাহিনীর নিজের অনুসন্ধানে ৩০ জন মেয়ে উপস্থিত হন, তার মধ্যে গোপনে জবানবন্দি নেওয়া হলে ১৩ জন মেয়ে বলেন তাঁরা ধর্ষণের শিকার, তা সত্ত্বেও কোন যুক্তি ছাড়াই তদন্ত ‘সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র’ আখ্যা দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়। [২]
সেই সময়ে মানুষ সবচেয়ে হতাশ হয়েছিলেন কাশ্মীরের ডিভিশনাল কমিশনার ওয়াজাত হাবিবুল্লার রিপোর্টে৷ উক্ত রিপোর্টে বলা হয়, অভিযোগকারিণী বা অভিযুক্তের সংখ্যার কোনও ঠিক নেই, তাই অভিযোগটাকেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না৷ এমন কী তখনকার প্রেস কাউন্সিলের প্রধান প্রখ্যাত সাংবাদিক বিজি ভার্গিসও ঘটনার সত্যতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে রিপোর্ট দেন, আক্রান্তদের অভিযোগ তিনি গ্রাম দু’টিতে কোনও দিন আসেননি, বারামুল্লার সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরে বসেই তদন্ত সেরেছিলেন৷ পরবর্তী বিজি ভার্গিস একই মত পোষণ করেন৷ এভাবে রাষ্ট্র বরাবরের মতো সার্বিকভাবে ধর্ষক সেনাবাহিনীকে সহায়তা করে বিষয়টি ধাঁমাচাপা দেয়।
এরপর আর কখনো স্বাভাবিক হয়নি কুনান পোশপোরায় মানুষের জীবন, সেখানে মেয়েদের বিয়ে দিতে অসুবিধে হয়েছে, বহু মেয়ে বিয়ে করেননি, বাচ্চাদের প্রতি কটাক্ষ উড়ে এসেছে যে সেনাবাহিনীর লোকেরাই তাদের বাবা, ধর্ষণ অনেককে শারীরিক ভাবে পঙ্গু করেছে৷ তবু মেয়েরা বার বার সুবিচারের আশায় নানা দরজায় কড়া নেড়েছেন, অনেকে আজ প্রয়াত, বাকিরা মৃত্যুর আগে বিচারের দেখে যাবার ভাবনাও ভুলে গেছেন কিন্তু যন্ত্রণাটা ভুলতে পারেননি, যা আজও তাদের তাড়া করে ফেরে।
২০১২ সালে দিকে কিছু নারীবাদী সংগঠন সে ঘটনার সুষ্ঠ তদন্ত ও পুনর্বিচারের দাবিতে সোচ্চার হলে ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তারিখে কুনান পোশপোরায় হাজির হয়েছিলেন কাশ্মীরের তত্কালীন আইনমন্ত্রী সইফুল্লা মীর। তিনি ৩৯২৫০০০ টাকা নগদ হাতে নিয়ে, নিগ্রহের শিকার মেয়েদের জন্য ‘সরকারি ভাবে ক্ষতিপূরণের’ টাকা বলে দাবি করেন৷ ঠিক কী উদ্দেশ্য নিয়ে, কোনও দপ্তর এই টাকা খরচের জন্য বরাদ্দ করেছে সেই খবর আরটিআই করে জানা যায়, সেই উদ্দেশ্যে সরকার থেকে কোনও টাকা বরাদ্দই করা হয়নি৷ এভাবেই প্রভাবশালী রাজনীতিবিদরা সেনাবিহিনীকে বাঁচানোর জন্য নগদ টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ রাখার চেষ্টা করে এসেছে। এখন ত্রিশ বছর অতিবাহিত হলো , কিন্তু বিচার দেখার ভাগ্য হলো না কুনান ও পোশপোরার বাসিন্দাদের।
শুধু কুনান-পোশপোরা নয়, ভারত অধিকৃত সমগ্র কাশ্মীর উপত্যকায় একই চিত্র বিরাজ করছে। বিতর্কৃত 'সশস্ত্র বাহিনী বিশেষ ক্ষমতা আইন' (এএফএসপিএ) এর বলে ভারতীয় সেনাবাহিনী বর্বরতা অব্যাহত রেখেছে এবং সম্পূর্ণ দায়মুক্তি ভোগ করছে। বিতর্কিত আইনটির ফলে ভারতীয় সেনা কর্মীদের উপত্যকায় যে কোনও সময় তল্লাশি ও পরোয়ানা ছাড়াই যে কোনও জায়গায় প্রবেশ করতে পারে। প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের পূর্ণ স্বাধীনতাও দেয়া আছে তাদের। আর এই সেনাবাহিনীর হাতে গত কয়েক দশকেই প্রাণ হারিয়েছেন লক্ষাধিক কাশ্মীরি মুসলিম। শ্রীলতাহানি তো ভারতীয় বর্বর বাহিনীর নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। সেখানে মেয়েদের মূলত চারটি পরিচয়--- ধর্ষিতা, বিধবা, আধা-বিধবা আর ‘yet to be raped’!
শুধু কুনান- পোশপোরা নয়, আরও অসংখ্য মুসলিম নারীর সম্মান কেড়ে নিয়েছে হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় সৈনিকেরা। বিচার হয়নি।
তথ্যসূত্র ও সহায়িকা:
[১] All These Years Later, Do Not Forget the Kunan-Poshpora Mass Rapes - https://tinyurl.com/3v4eczc6
[২] পঁচিশটি বছর অতিক্রান্ত, ‘সুবিচার’ এল কি? - https://tinyurl.com/7ujz8b5y
কৃতজ্ঞতায়- RealityCheckBD
আল-আকসা মসজিদ কি শিগগিরই বন্ধ হতে যাচ্ছে?
গাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে সুদানের দুর্ভিক্ষ: ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে রমজানের আগমন
গাজায় “দ্য ভ্যাপোরাইজড”: এক অনুসন্ধানে এমন ইসরায়েলি অস্ত্রের তথ্য উঠে এসেছে, যা হাজারো ফিলিস্তিনিকে নিশ্চিহ্ন
নেতানিয়াহুর বন্ধুর কবজায় টিকটক: অ্যালগরিদমের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই
গাজা এখন “আল-মসীহ আদ-দাজ্জাল”-এর শাসনের অধীনে
ইহুদি ধর্মগ্রন্থ, জায়নবাদ ও মুসলিমদের জন্য সচেতন পাঠ: ইতিহাস, আদর্শ ও বাস্তবতার মুখোমুখি
ইজরায়েলি সংসদে গাজা বাস্তুচ্যুতি এজেন্ডা: ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দিতে নতুন পরিকল্পনার আলোচনা
সিলেট দা’ওয়াহ সেন্টারে নাসীহাহ সেশন: সবার জন্য দ্বীন শিক্ষায় মসজিদ কেন্দ্রিক উদ্যোগের আহ্বান
হালাল অ্যাওয়ারনেস নেটওয়ার্কের নির্বাহী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত
যুক্তরাজ্যে বাড়ছে তরুণ মেধাবীদের দেশত্যাগের প্রবণতা
লন্ডনে তা'লিমুল কুরআন মসজিদের ১২তম বার্ষিক ওয়াজ মাহফিল সম্পন্ন
সিম্পল রিজনের উদ্যোগে সিলেটে দিনমজুরদের মাঝে দা’ওয়াহ কার্যক্রম ও ফুডপ্যাক বিতরণ সম্পন্ন
ইসলামের চিন্তা ও একদল ভুল মানুষ
হামলা যেদিকে আসে মোকাবিলাও সেদিকে করতে হয়
শায়খে বাঘা রহ.’এর নামে পাকিস্তানে মসজিদ নির্মাণ করছে সিম্পল রিজন চ্যারিটি
আল-আকসা মসজিদ কি শিগগিরই বন্ধ হতে যাচ্ছে?
গাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে সুদানের দুর্ভিক্ষ: ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে রমজানের আগমন
গাজায় “দ্য ভ্যাপোরাইজড”: এক অনুসন্ধানে এমন ইসরায়েলি অস্ত্রের তথ্য উঠে এসেছে, যা হাজারো ফিলিস্তিনিকে নিশ্চিহ্ন
নেতানিয়াহুর বন্ধুর কবজায় টিকটক: অ্যালগরিদমের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই
গাজা এখন “আল-মসীহ আদ-দাজ্জাল”-এর শাসনের অধীনে
ইহুদি ধর্মগ্রন্থ, জায়নবাদ ও মুসলিমদের জন্য সচেতন পাঠ: ইতিহাস, আদর্শ ও বাস্তবতার মুখোমুখি
ইজরায়েলি সংসদে গাজা বাস্তুচ্যুতি এজেন্ডা: ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দিতে নতুন পরিকল্পনার আলোচনা
সিলেট দা’ওয়াহ সেন্টারে নাসীহাহ সেশন: সবার জন্য দ্বীন শিক্ষায় মসজিদ কেন্দ্রিক উদ্যোগের আহ্বান
হালাল অ্যাওয়ারনেস নেটওয়ার্কের নির্বাহী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত
যুক্তরাজ্যে বাড়ছে তরুণ মেধাবীদের দেশত্যাগের প্রবণতা
লন্ডনে তা'লিমুল কুরআন মসজিদের ১২তম বার্ষিক ওয়াজ মাহফিল সম্পন্ন
সিম্পল রিজনের উদ্যোগে সিলেটে দিনমজুরদের মাঝে দা’ওয়াহ কার্যক্রম ও ফুডপ্যাক বিতরণ সম্পন্ন
ইসলামের চিন্তা ও একদল ভুল মানুষ
হামলা যেদিকে আসে মোকাবিলাও সেদিকে করতে হয়
শায়খে বাঘা রহ.’এর নামে পাকিস্তানে মসজিদ নির্মাণ করছে সিম্পল রিজন চ্যারিটি