তাফসিরে ইবনু কাসিরের বর্ণনা অনুযায়ী, আসহাবে কাহফ ছিলেন বাইজেন্টিয়াম নগরীর সম্ভ্রান্ত ও ধনী পরিবারের সাতজন তরুণ। সে সময় শহরটি শাসন করতেন অত্যাচারী রাজা দাকইয়ানুস। সেই নগরীর প্রধান ধর্ম ছিল মূর্তিপূজা। নির্দিষ্ট সময় পরপর একটি উৎসব অনুষ্ঠিত হতো, যেখানে সাধারণ মানুষ নানা ধরনের মূর্তিপূজার অনুষ্ঠানে অংশ নিত।
কিন্তু আল্লাহ এই সাত তরুণকে তাওহিদের বিশুদ্ধ ঈমান দান করেছিলেন। ফলে তারা ধীরে ধীরে নিজেদের সম্প্রদায় থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেন এবং মূর্তিপূজায় অংশ নেওয়া মানুষের সমাবেশ এড়িয়ে চলতেন। একসময় তারা একটি গাছের নিচে একত্রিত হন। প্রথমে তারা একে অপরের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিলেন। কিন্তু এক আল্লাহর প্রতি ঈমানই তাদের একত্র করেছিল। তারা পরস্পরের সামনে নিজেদের ঈমানের কথা প্রকাশ করেন। পরে লোকজন যখন তাদের একসঙ্গে আল্লাহর ইবাদত করতে দেখল, তখন বিষয়টি রাজার কাছে জানিয়ে দেয়।
তারা রাজার সামনেও আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা দেন। কিন্তু রাজা তাদের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেন। প্রত্যাশিতভাবেই তাদের সমাজ থেকে নির্বাসিত করা হয়। রাজা তাদের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেন। হয় তারা আগের ধর্মে ফিরে যাবে, নয়তো নির্যাতনের মুখোমুখি হবে।
এরপর নিজেদের ঈমান ও জীবন রক্ষার জন্য তারা নিজ শহর ও সেখানকার মানুষদের ছেড়ে পালিয়ে যান। আল্লাহ তাদের এমনভাবে হেফাজত করেন যে রাজা তাদের খুঁজে বের করার নির্দেশ দিলেও কেউ তাদের কোনো সন্ধান পায়নি।
পুরস্কার ও সুরক্ষা হিসেবে অলৌকিক নিদর্শন
পবিত্র কুরআনে উল্লেখ রয়েছে, আল্লাহ এই তরুণদের নানা উপায়ে পুরস্কৃত করেছিলেন। তাদের অবিচল ঈমান ও ধৈর্যের প্রতিদান হিসেবে আল্লাহ তাদের জন্য একের পর এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটিয়েছিলেন। তারা যে কাজটি করেছিলেন, তা মোটেও সহজ ছিল না। এত অল্প বয়সে ক্ষমতাবান শাসকের সামনে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো কল্পনাও করা কঠিন। তারা শুধু অন্তরে ঈমান ধারণ করেই থেমে থাকেননি, বরং একজন অত্যাচারী রাজার সামনে প্রকাশ্যে সেই ঈমানের ঘোষণা দিয়েছিলেন।
আল্লাহ তাদের জন্য জনমানবহীন পাহাড়ের একটি গুহাকে আশ্রয়স্থল বানিয়ে দেন। এরপর তাদের নিরাপত্তার জন্য আরও বহু অলৌকিক ব্যবস্থা করেন। তাদের ওপর এমন এক ঘুম নেমে আসে, যা কয়েক বছর নয়, বরং কয়েক শতাব্দী স্থায়ী হয়। এর ফলে তারা জেগে ওঠার আগেই তাদের সব শত্রু পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়।
গুহার ভেতরে সূর্যের আলো ও ছায়ার এমন ব্যবস্থা ছিল যে প্রাকৃতিক কোনো উপাদান তাদের ক্ষতি করতে পারেনি। আল্লাহ তাদের দেহকে নিয়মিত এক পাশ থেকে অন্য পাশে ফিরিয়ে দিতেন। ঘুমিয়ে থাকলেও তাদের চোখ খোলা ছিল। আল্লাহ তাদের এমন ভীতিকর অবয়ব দান করেছিলেন যে কেউ গুহার কাছে এলে ভয়ে ফিরে যেত। আর তাদের কুকুরটি পুরো সময় গুহার প্রবেশপথ পাহারা দিত।
যখন তারা জেগে উঠলেন, তখন তাদের মনে হলো তারা হয়তো মাত্র একদিন অথবা দিনের একটি অংশ ঘুমিয়েছিলেন। এ থেকেই বোঝা যায়, শত শত বছর ঘুমিয়ে থাকলেও তাদের বয়স একটুও বাড়েনি। তারা তখনও তরুণ ছিলেন এবং তাদের ঈমানও ছিল অটুট। কিন্তু তাদের প্রধান শত্রুরা, তাদের পূজিত মূর্তিগুলো, সম্পদ এবং তাদের ভ্রান্ত সমাজব্যবস্থা বহু আগেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
সূরা আল কাহফে মুসলিম তরুণদের জন্য লুকিয়ে থাকা পাঁচটি মূল্যবান শিক্ষা
যে ব্যক্তি গভীরভাবে চিন্তা করবে, তার জন্য আসহাবে কাহফের ঘটনায় রয়েছে অসংখ্য শিক্ষা। যৌবন জীবনের খুবই ক্ষণস্থায়ী একটি সময়। অল্পসংখ্যক তরুণই সমবয়সীদের বিরোধিতা, সমাজের অবহেলা কিংবা নির্যাতনের মুখোমুখি হওয়ার সাহস রাখে। পরিবারের বিরোধিতা, সমাজের প্রবীণদের চাপ, বৃহত্তর জনগোষ্ঠী কিংবা রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরোধিতার সামনে দাঁড়ানো তো আরও কঠিন।
অধিকাংশ তরুণেরই এমন সামাজিক প্রভাব বা অর্থনৈতিক শক্তি থাকে না, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের জীবনকে বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।
এই বাস্তবতা বিবেচনা করলে বোঝা যায়, এই সাত তরুণ ঈমানের ক্ষেত্রে কতটা দৃঢ় ছিলেন। আল্লাহ তাদের কঠিন পরীক্ষার সময় অবিচলতা ও ধৈর্য দান করেছিলেন।
তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের পরিবার, বাড়িঘর, সম্পদ এবং সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ পর্যন্ত ত্যাগ করেছিলেন। আজকের মুসলিম তরুণরা তাদের জীবন থেকে অন্তত এই পাঁচটি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
প্রথম শিক্ষা
দৃঢ় ঈমান সমাজ, সম্প্রদায় এমনকি রাষ্ট্র পর্যায়েও গভীর পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এই পরিবর্তন রাতারাতি আসে না, সময় লাগে। তাই আল্লাহর প্রতি আন্তরিক ও বিশুদ্ধ ঈমানের শক্তিকে কখনোই ছোট করে দেখা উচিত নয়।
দ্বিতীয় শিক্ষা
আল্লাহ যাদের ভালোবাসেন, তাদের পরীক্ষা করেন। কেউ যখন সত্যিকার অর্থে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, তখন আল্লাহ তাকে পরিবার, সম্পদ এবং সামাজিক মর্যাদার মাধ্যমে পরীক্ষা করেন। অনেক সময় একজন তরুণ নিজের ঈমান প্রকাশ করার কারণে সাময়িকভাবে এসব নিয়ামত হারিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু যদি সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, তাহলে আল্লাহ তাকে আগের চেয়েও উত্তমভাবে সেই নিয়ামত ফিরিয়ে দেন।
তৃতীয় শিক্ষা
আল্লাহর নেওয়া পরীক্ষায় একজন আন্তরিক মুমিন সফল হলে তার প্রতিদান হয় দুনিয়ার সাধারণ হিসাবের বাইরের। এমন মুমিনের জীবনে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিস্ময়কর সাহায্য আসতে পারে। বিশেষ করে মানুষ যখন তার ক্ষতি করার চেষ্টা করে, তখন আল্লাহর বিশেষ হেফাজত তাকে রক্ষা করে। অলৌকিকতার কাছাকাছি এমন সাহায্য আল্লাহ তাঁর বিশেষ বান্দাদের জন্য সংরক্ষণ করে রাখেন।
চতুর্থ শিক্ষা
নিজের ঈমান রক্ষার জন্য কোনো স্থান বা কোনো জনগোষ্ঠী ছেড়ে চলে যাওয়া ইসলামে বৈধ। শেষ পর্যন্ত প্রকৃত বিজয়ী কে, তা সময়ই প্রমাণ করে। অনেক অত্যাচারী অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা বা নিপীড়ন করে আনন্দ প্রকাশ করে। কিন্তু আল্লাহর শাস্তি ধীরে ধীরে হলেও নিশ্চিতভাবেই তাদের ওপর নেমে আসে। প্রথম দিকে মনে হতে পারে, অবিশ্বাসী রাজাই জয়ী হয়েছে এবং সাত তরুণ পরাজিত হয়েছে। কারণ তারা পালিয়ে গিয়ে গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল। রাজা ও তার অনুসারীরা হয়তো তাদের নিয়ে উপহাসও করেছিল।
কিন্তু একটু ভেবে দেখুন, শেষ পর্যন্ত প্রকৃত বিজয় কার হয়েছিল?
যখন এই তরুণরা জেগে উঠলেন, তখন তাদের বয়স বাড়েনি, তাদের ঈমানও অটুট ছিল। অথচ তাদের শত্রুরা, সেই রাজা এবং তার সমাজ বহু আগেই পৃথিবী থেকে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। আজকের মুসলিম তরুণদেরও ক্ষণস্থায়ী পার্থিব লাভের চেয়ে দ্বীনের দীর্ঘমেয়াদি সফলতাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
পঞ্চম শিক্ষা
মুমিনের জন্য আল্লাহর জমিন অনেক বিস্তৃত। আমরা প্রায়ই সমাজের স্বীকৃতি, সামাজিক মর্যাদা, সম্পদ এবং মানুষের কাছে নিজের অবস্থান নিয়েই বেশি চিন্তা করি।
সমাজ আমাদের জন্য যে সীমিত জীবনধারা নির্ধারণ করে দেয়, আমরা নিজেদেরও অনেক সময় সেই সীমার মধ্যেই আটকে ফেলি।
কিন্তু কুরআন আমাদের ভিন্ন শিক্ষা দেয়। কুরআন শেখায়, যে মুমিন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস রাখে, তার জন্য একটি গুহাও নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠতে পারে। আর সর্বোত্তম জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলারই।
তারিখ: ২৮ জুলাই ২০২৬
কৃতজ্ঞতায়: Sunnah File Web
মুসলিম তরুণদের জন্য সূরা আল-কাহফের ৫টি অনুপ্রেরণাদায়ক শিক্ষা
যুক্তরাজ্যে প্রতি পাঁচ দিনেই একটি মসজিদে হামলা: বাড়ছে ইসলামবিদ্বেষ, শঙ্কায় মুসলিম সমাজ
লন্ডনে AMTC-এর উদ্যোগে উদ্যোক্তা ও ফাউন্ডার মিটিং অনুষ্ঠিত
উইঘুর মুসলিমদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় হুমকিতে ফেলছে চীনের নতুন আইন
ভারসাম্যপূর্ণ জীবন যাপন করো
যুক্তরাজ্যে তাবলিগের ইজতেমায় হামলার আশঙ্কায় ডজনখানেক সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার
গাজার কামাল আদওয়ান হাসপাতালে ইসরায়েলি ড্রোন হামলা; আহত ৬
গাজায় আবারও যুদ্ধ শুরুর ইঙ্গিত ইসরায়েলের
বিভাজনের নীতি প্রত্যাখ্যান করে প্রতিরোধের পথেই অবিচল গাজাবাসী
যুক্তরাজ্যে ইমামের বাড়িতে পেট্রোলবোমা হামলা, মসজিদের বাইরে উদ্ধার সন্দেহজনক বস্তু
পশ্চিমা দেশ ছেড়ে হিজরাহ: সন্তান প্রতিপালনে কেন দুবাই-সৌদির চেয়ে মিশর এগিয়ে?
মাওলানা পীর মুজাফফর আহমদ: রোহিঙ্গা মুসলিমদের এক আধ্যাত্মিক অভিভাবক
বিশিষ্ট আলেম ও গহরপুর মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা কবির আহমদের ইন্তেকাল
ফুটবল বিশ্বকাপে মাতোয়ারা বিশ্ব, গাজায় চলছে টিকে থাকার চরম লড়াই
গাজায় ফের বড় অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী
মুসলিম তরুণদের জন্য সূরা আল-কাহফের ৫টি অনুপ্রেরণাদায়ক শিক্ষা
যুক্তরাজ্যে প্রতি পাঁচ দিনেই একটি মসজিদে হামলা: বাড়ছে ইসলামবিদ্বেষ, শঙ্কায় মুসলিম সমাজ
লন্ডনে AMTC-এর উদ্যোগে উদ্যোক্তা ও ফাউন্ডার মিটিং অনুষ্ঠিত
উইঘুর মুসলিমদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় হুমকিতে ফেলছে চীনের নতুন আইন
ভারসাম্যপূর্ণ জীবন যাপন করো
যুক্তরাজ্যে তাবলিগের ইজতেমায় হামলার আশঙ্কায় ডজনখানেক সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার
গাজার কামাল আদওয়ান হাসপাতালে ইসরায়েলি ড্রোন হামলা; আহত ৬
গাজায় আবারও যুদ্ধ শুরুর ইঙ্গিত ইসরায়েলের
বিভাজনের নীতি প্রত্যাখ্যান করে প্রতিরোধের পথেই অবিচল গাজাবাসী
যুক্তরাজ্যে ইমামের বাড়িতে পেট্রোলবোমা হামলা, মসজিদের বাইরে উদ্ধার সন্দেহজনক বস্তু
পশ্চিমা দেশ ছেড়ে হিজরাহ: সন্তান প্রতিপালনে কেন দুবাই-সৌদির চেয়ে মিশর এগিয়ে?
মাওলানা পীর মুজাফফর আহমদ: রোহিঙ্গা মুসলিমদের এক আধ্যাত্মিক অভিভাবক
বিশিষ্ট আলেম ও গহরপুর মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা কবির আহমদের ইন্তেকাল
ফুটবল বিশ্বকাপে মাতোয়ারা বিশ্ব, গাজায় চলছে টিকে থাকার চরম লড়াই
গাজায় ফের বড় অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী